ক) বিভাগের গুরুত্ব ও ইতিহাস
পৃথিবীর মোট পৃষ্ঠতলের প্রায় ৭১ শতাংশ জুড়ে রয়েছে সমুদ্র। এই বিশাল জলরাশিতে রয়েছে বৈচিত্র্যময় মাছ এবং নানা ধরনের প্রাণী ও উদ্ভিদ। পৃথিবীতে উৎপন্ন অক্সিজেনের প্রায় অর্ধেক আসে সমুদ্র থেকে, যার মূল উৎস সমুদ্রের উদ্ভিদকণা বা ফাইটোপ্ল্যাংকটন। মানুষের সৃষ্ট কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রায় ৩০ শতাংশ শোষণ করে সমুদ্র জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আবার ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সুনামির মতো বড় দুর্যোগের উৎসও এই সমুদ্র। মেরিন সায়েন্স বা সমুদ্রবিজ্ঞান সমুদ্রের ভৌত, রাসায়নিক, ভূতাত্ত্বিক ও জৈবিক প্রক্রিয়া এবং সামুদ্রিক সম্পদ নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করে। মাৎস্যবিজ্ঞানের সঙ্গে এর সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৮ সালে ফিশারিজ বিভাগ হিসেবে মাৎস্যবিজ্ঞান শিক্ষার যাত্রা শুরু হয়। ২০১০ সালে এটি মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদে উন্নীত হয়। সমুদ্র বিষয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রয়োজন থেকে অনুষদটি ২০১০ সালে "মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড ওশানোগ্রাফি" বিভাগ চালু করে। পরবর্তীতে বিভাগের পাঠ্যক্রম ও গবেষণার পরিসর বিবেচনায় ৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৬তম একাডেমিক কাউন্সিল বিভাগটির নাম পরিবর্তন করে "মেরিন সায়েন্স বিভাগ" রাখে।
বর্তমানে সারা বিশ্বে Blue Economy বা সমুদ্রনির্ভর অর্থনীতি একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত। ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন বিষয়ক ট্রাইব্যুনালে (ITLOS) মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি হয়। ২০১৪ সালে স্থায়ী সালিশি আদালতে (PCA) নিষ্পত্তি হয় ভারতের সঙ্গে বিরোধ। ভারতের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ ২৫,৬০২ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে বাংলাদেশ পায় ১৯,৪৬৭ বর্গকিলোমিটার। এর ফলে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি সমুদ্র এলাকার ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, যার মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রাধীন সমুদ্র ও ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল। পাশাপাশি চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সমুদ্রতলের সব প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। এরপর থেকে সুনীল অর্থনীতি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের মোট মৎস্য উৎপাদন ছিল ৫০.১৮ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে সামুদ্রিক উৎস থেকে এসেছে ৬.২৯ লাখ মেট্রিক টন, অর্থাৎ মাত্র সাড়ে ১২ শতাংশ। দেশে ৪৭৫ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ রয়েছে। মৎস্য খাত জাতীয় জিডিপিতে ২.৫৩ শতাংশ অবদান রাখছে। বিশাল সমুদ্র এলাকার তুলনায় সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ এখনো কম, যা এ খাতে বিপুল সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জলসীমায় রয়েছে বিপুল সম্পদ, যার বড় অংশ এখনো অনাবিষ্কৃত। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীপ্রণালী প্রতিবছর প্রায় ১০০ কোটি টন পলি বয়ে আনে, যা বিশ্বের বৃহত্তম নদীবাহিত পলিপ্রবাহগুলোর একটি। বঙ্গোপসাগরে ইতিমধ্যে তেল, গ্যাস ও ভারী খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে। উপকূলের ১৭টি সৈকত বালু মজুদে প্রায় ৪৪ লাখ টন ভারী খনিজ চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ আটটি খনিজ হলো ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, জিরকন, রুটাইল, গার্নেট, লিউকোক্সিন, কায়ানাইট ও মোনাজাইট। সঠিকভাবে আহরণ ও ব্যবস্থাপনা করা গেলে এসব সম্পদ থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হয় সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে। ফলে সমুদ্রবন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়বে, সেই সঙ্গে সৃষ্টি হবে ব্যাপক কর্মসংস্থান।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটাতে সমুদ্রের সঞ্চিত সম্পদের দিকে তাকিয়ে আছে। জাতিসংঘের World Population Prospects 2024 অনুযায়ী ২০৫০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৯৭০ কোটি। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্যের যোগান দিতে সমুদ্রের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে। বিশ্বের ৩০০ কোটিরও বেশি মানুষের জীবিকা সামুদ্রিক ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল। সামুদ্রিক মৎস্য খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২০ কোটিরও বেশি মানুষ নিয়োজিত। বিশ্বে প্রায় ৩২০ কোটি মানুষের মাথাপিছু প্রাণিজ প্রোটিনের অন্তত ২০ শতাংশ আসে সমুদ্র উৎস থেকে। এছাড়া বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ আসে সমুদ্রতলের তেলক্ষেত্র থেকে। তাই সমুদ্র বিষয়ে পড়াশোনা ও গবেষণার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
তবে বাংলাদেশে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও জীবজগৎ এবং সমুদ্রের ভৌত, রাসায়নিক ও ভূতাত্ত্বিক বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। বঙ্গোপসাগরের বহু বিষয় আজও অজানা, তাই এ দেশে সমুদ্রবিজ্ঞানে গবেষণার বিস্তৃত সুযোগ রয়েছে। সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। সমুদ্রদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও অন্যান্য বিরূপ পরিস্থিতি প্রতিরোধ ও মোকাবিলাও জরুরি। এর জন্য সমুদ্র সম্পর্কিত নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ অপরিহার্য। অথচ দেশে সমুদ্র গবেষণায় দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি রয়েছে। এ বিষয়ে পড়াশোনা করে একজন শিক্ষার্থী তার মেধা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারেন। দেশে ও বিদেশে সমুদ্রবিজ্ঞান ও সামুদ্রিক মৎস্য সংশ্লিষ্ট কর্মক্ষেত্র ব্যাপক ও বিস্তৃত। দেশের টেকসই সুনীল অর্থনীতি প্রসারের লক্ষ্যে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কুয়াকাটায় "মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট" স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
খ) বি.এসসি. (অনার্স) ফিশারিজ ডিগ্রিতে বিভাগের কোর্সসমূহ
গ) এমএস ইন মেরিন সায়েন্স প্রোগ্রামের কোর্সসমূহ
জানুয়ারি-জুন (JJ) সেমিস্টার
জুলাই-ডিসেম্বর (JD) সেমিস্টার
রিসার্চ সেমিস্টার
ঘ) শিক্ষক ও কর্মচারী
চেয়ারম্যান: আবদুল্লাহ-আল-হাসান
সহযোগী অধ্যাপক: আবদুল্লাহ-আল-হাসান
সহকারী অধ্যাপক: মোঃ রাশেদুল ইসলাম
কর্মচারী সংখ্যা: ০২ জন